(Image: Alexander Historical Auctions/Raymonds P)

প্রথম দৃষ্টিতে উপরের ছবিটিকে খুব সাধারণ কোনো দৃশ্য বলেই মনে হয়। এক হাস্যোজ্জ্বল ছোট্ট মেয়ে তাকিয়ে আছে ক্যামেরার দিকে আর তার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে এক ব্যক্তি। শিশুটির হাসিমুখ দেখে মনে হয় তার খুব প্রিয় এক আঙ্কেলের সাথে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার চোখে স্পষ্ট খুশির আভা। একইসাথে খুব সাধারণ কিন্তু মায়াভরা এই ছবিটি তুলেছিলেন বিখ্যাত আলোকচিত্রী হেইরিক হফম্যান।

কিন্তু ছবির মানুষগুলোর দিকে একটু ভালো করে তাকালেই ধরা দিবে ছবিটির অন্ধকার দিক। ছবির মধ্যে মধ্যবয়স্ক লোকটি আর কেউ নয়, জার্মান একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার আর তার সাথে দাঁড়ানো ছোট্ট মেয়েটি হচ্ছে রোসা বেরনিল নেইনাউ নামের এক ইহুদি শিশু। ছোট্ট রোসা তখন জানতো না যে তার প্রিয় ‘আঙ্কেল হিটলার’-এর কারণেই প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে প্রাণ দিতে হবে। তা জানলে হয়তো তার নিষ্পাপ হাসি রূপ নিত ভীত চাহনিতে।

প্রায় তিন বছর স্থায়ী হয়েছিল হিটলারের সাথে রোসার বন্ধুত্ব। এই অবাক করা বন্ধুত্বের মূলে ছিল তাদের মাঝে এক কাকতালীয় মিল। ইতিহাসের মেরুকরণে পুরোপুরি বিপরীত পাশে অবস্থান করা এই দুইজন পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল একইদিনে, ২০শে এপ্রিল।

ছবিটির পেছনের কাহিনিটিও বড় অদ্ভূত। দিনটি ছিল ১৯৩৩ সালের ২০শে এপ্রিল; আলপাইন রিট্রিট বেভারিয়ানে চলছিল হিটলারের জন্মদিনের জমজমাট অনুষ্ঠান। জন্মদিন উপলক্ষে বাড়ির বাইরে অনেক মানুষ সমবেত হয়েছিল সেদিন। অন্যান্যদের মতো ছোট্ট রোসাও মা ক্যারোলিনের হাত ধরে হিটলারের বাড়ির বাইরে উপস্থিত হয়েছিল। সেখানেই হিটলারের সাথে প্রথম সাক্ষাত হয় রোসার।

ধারণা করা হয় যে, হিটলার যখন জানতে পারে সেদিন রোসারও জন্মদিন তখন হিটলার তাকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায়। হিটলারের বাসভবনেই তখন এই ছবিটি তোলা হয়। তাদের সম্পর্কের মধ্যে চমকপ্রদ তথ্য এটাই যে, রোসা যে ইহুদি তা হিটলার জানত।

ছবিটি তোলা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র ছয় বছর আগে। হিটলার তখনো ইহুদীদের বিরুদ্ধে তার চূড়ান্ত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে নি কিন্তু ইতিমধ্যেই সে ও তার নাৎসি বাহিনী জার্মান মানুষদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রবলভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। ইহুদিরা ধীরে ধীরে একঘরে হয়ে যাচ্ছিল। নিজ দেশে তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মত থাকতে হচ্ছিল।

এতকিছুর পরেও হিটলারের সাথে রোসার সম্পর্ক ছিল অবিচ্ছিন্ন । ছবি তোলার ঘটনার পরেও তিন বছর হিটলার রোসার সাথে তার বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলে। কিন্তু তাদের সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায় হিটলারের ব্যক্তিগত সচিব মার্টিন বরম্যান।

মূলত ইহুদি হওয়ার কারণেই তিনি রোসার মা ক্যারোলিনকে জানিয়ে দেন যেন রোসা আর হিটলারের সাথে যোগাযোগ না করে। পাশাপাশি আলোকচিত্রী হেইনরিক হফম্যানকেও হিটলার এবং রোসার ছবিটি প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়। এভাবেই এই বিচিত্র বন্ধুত্বের সমাপ্তি ঘটে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪৩ সালে মিউনিখের একটি হাসপাতালে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৭ বছর বয়সে মারা যায় রোসা।

রোসা ও তার ‘আঙ্কেল হিটলার’ (Image: Alexander Historical Auctions/Raymonds P)

উপরের সেই ছবিটি  ২০১৮ সালের ১৩ই নভেম্বর আমেরিকার চেসাপিক শহরে অ্যালেক্সজান্ডার হিস্টোরিকাল অকশনস-এ এক নিলামে বিক্রি হয়, যার মূল্য উঠেছিল ১১,৫২০ মার্কিন ডলার। ছবিটিতে নীল কালি দিয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন হিটলার নিজেই। পাশাপাশি তিনি ছবিটির গায়ে লিখেছিলেন, “The dear and considerate Rosa Nienau, Adolf Hitler, Munich, the 16th June 1933”. 

নিলামকৃত ছবিটি হিটলার তার স্বাক্ষরসহ রোসার কাছে পাঠায়। ছোট্ট রোসা ছবিটির উপর এঁকে ফেলে ফুলের ছবি।

ছবিটির নিলামকারী সংস্থার মালিক বিল পানাগোপুলোস বলেন, ‘ছবিটি স্বাক্ষরিত সংস্করণটি সবসময় দেখা যায় না। ছবিটির মাধ্যমে ইহুদি হওয়া সত্ত্বেও ছোট মেয়েটির প্রতি এডলফ হিটলার যে উষ্ণতা দেখিয়েছেন তা অভাবনীয়।’

 (Image: Alexander Historical Auctions/Raymonds P)

তিনি আরো বলেন, ‘ হিটলার প্রায়ই প্রচারণার উদ্দেশ্যে শিশুদের সাথে ছবি তুলতো। কিন্তু এই ছবিটিতে হিটলার শিশুটির প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়েছে তা দেখে আমি সত্যিই হতভম্ব হয়ে গিয়েছি।’

‘ছোট মেয়েটি ‘আঙ্কেল হিটলার’ এর সাথে যে গভীর এবং উষ্ণ সম্পর্ক স্থাপন করেছিল তা ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এমনকি ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে সর্বমোট ১৭টি চিঠি রোসা তার আঙ্কেল হিটলারের উদ্দেশ্যে লিখেছিল’।

আলোকচিত্রী হেইনরিক হফম্যান এইসকল বিষয় উল্লেখ করে ‘হিটলার ওয়াজ মাই ফ্রেন্ড’ নামে একটি বই লিখেছেন। সেই বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন মার্টিন বরম্যানের রোসাদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিতে হিটলার খুশি ছিলেন না। ‘আমার প্রতিটি আনন্দ ভঙ্গ করে দেওয়ার জন্য এখানে কিছু মানুষ আছে’ হিটলার বরম্যানের কাণ্ডে এমন একটি মন্তব্যও করেছিল বলে হফম্যান বইটিতে দাবি করেছেন।

 (Image: Alexander Historical Auctions/Raymonds P)

‘হিটলার ওয়াজ মাই ফ্রেন্ড’ বইটি ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়। বইটিতে হিটলারের সাথে মেয়েটির ছবি প্রকাশ করেছিলেন হফম্যান এবং তাতে শিরোনাম দিয়েছিলেন “Hitler’s Sweetheart”। হফম্যান বইটিতে বলেন, ‘হিটলার এই বালিকাটিকে দেখে পূর্ণ আনন্দ পেতেন যতক্ষণ না পর্যন্ত কিছু লোক খুঁজে বের করে যে, সে পুরোপুরি আর্য নয়।’

যে বছর রোসার সাথে হিটলারের যোগাযোগ নিষিদ্ধ হয় সে বছরেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সেখানেই নাৎসি নেতা হিটলারের নেতৃত্বে হত্যা করা হয় লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে। পালিয়েও অনেকে প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকান্ডের মূল হোতার এক ইহুদি বালিকার সাথে এই উষ্ণ সম্পর্ক মানুষের বিস্ময়কর দ্বিমুখী স্বভাবের কথা আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়। হিটলার আর রোসার এই অদ্ভূত সম্পর্ক তাই সব সময় ইতিহাসে এক অবাক করা বন্ধুত্ব হিসেবে স্থান পাবে।

Reference:
Retrieved from- https://www.bbc.com/news/world-europe-46192941
Retrieved from- https://www.express.co.uk/news/history/1042843/nazi-adolf-hitler-friend-with-young-jewish-girl
Retrieved from- https://www.washingtonpost.com/history/2018/11/13/the-fuhrers-child-how-hitler-came-adore-girl-with-jewish-roots/?noredirect=on&utm_term=.71e67591f662

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *