তার জার্সি নাম্বার নাইন হলেও অন্যসব স্ট্রাইকারের সাথে তাকে মেলানো যায় না কোনোমতে। অার মেলানো যাবেই বা কীভাবে! কখনো তিনি বল পায়ে বাজপাখির মতো দুরন্ত গতিতে ঢুকে যাচ্ছেন প্রতিপক্ষের গোলবার অভিমুখে, অাবার কিছুক্ষণ পরই তাকে দেখা যাচ্ছে মিডফিল্ডে নেমে এসে সতীর্থ খেলোয়াড়কে থ্রু পাস বাড়াতে। অাবার কিছুক্ষণ পর তিনিই পর তিনি দূর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে অাটকে দিচ্ছেন বিপক্ষের অাক্রমণ। অাবার কখনো স্বভাবসুলভ ড্রিবলিংয়ে বিভ্রান্ত করছেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের।

যারা নিয়মিত প্রিমিয়ার লীগ ফুটবল দেখে অভ্যস্ত, তারা হয়তো ইতিমধ্য অান্দাজ করে ফেলতে পেরেছেন, কার কথা বলছি। হ্যা পাঠক, অলরেড খ্যাত লিভারপুলের অাক্রমণভাগের প্রাণভোমরা, ব্রাজিলিয়ান তারকা রবার্তো ফিরমিনোর কথাই বলছি অাজ।

পরিচয় ও শৈশব:

রবার্তো ফিরমিনোর পুরো নাম রবার্তো ফিরমিনো বারবোসা ডি অলিভিয়ার তার জন্ম ১৯৯১ সালের ২ অক্টোবর, ব্রাজিলের মেসিও অ্যালগোয়াসে। ফিরমিনোর বাবার নাম জোসে রবার্তো কার্ডিরো এবং মায়ের নাম মারিয়া সিনসি বারোসা ডি অলিভিয়ার। ছোটবেলায় তার ডাকনাম ছিলো ‘ববি’।

ফিরমিনোর বেড়ে ওঠা এক অপরাধ প্রবণ এলাকায়। এলাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারেন, এই অাশঙ্কায় তার মা তাকে রাস্তায় বেরুতে দিতেন না। ফিরমিনোর গন্ডিটা তাই সীমাবদ্ধ ছিলো বাসা এবং বাবার পানির ব্যবসার কর্মস্থলের মধ্যেই।

ফুটবলের পূণ্যভূমি ব্রাজিলে বসবাস করা প্রতিটি কিশোরেরই স্বপ্ন থাকে ফুটবল খেলে নিজের জাত চেনানোর। ফিরমিনোও তার ব্যাতিক্রম ছিলেন না। তাই বাবার কাজে সহায়তার ফাঁকে ফাঁকে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

নিজের এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে প্রায়ই ফিরমিনো বাসার চাবি চুরি করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন। প্রতিবেশী কিশোরদের সাথে মেতে উঠতেন ফুটবল উন্মাদনায়।
ফিরমিনোর বাবা মা বুঝে ফেলেন, ছেলেকে এভাবে ঘরে অাটকে রাখলে তার ফল খুব একটা সুখকর হবে না। তাই তারা তাকে এলাকার অলিগলিতে ফুটবল খেলার অনুমতি দেন। মূলত এখান থেকেই ফিরমিনোর ফুটবল প্রতিভার পরিস্ফুটিত হতে শুরু করে। ফিরমিনোর মা যখনই তার ঘরে রাতে উকি দিতেন, দেখতেন ফিরমিনো নিজের প্রিয় ফুটবলটিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে অাছে।

ফুটবল ক্যারিয়ারের অাদ্যোপান্ত:

ফিরমিনোর ফুটবল প্রতিভা স্থানীয় ক্লাব সিঅারবি কোচ লুইজের চোখে সর্বপ্রথম নজরে পড়ে। চৌদ্দ বছর বয়সী ফিরমিনোর খালি পায়ের নৈপূণ্য দেখে অবাক হন তিনি। ষোল বছর বয়সে তিনি সুযোগ পান সিঅারবি ক্লাবে, যা তার বাড়ি থেকে ষোলশ মাইল দূরে।

সিঅারবি থেকে ফিরমিনো ধারে খেলতে যান ফিগেইরেন্সে। এটি ব্রাজিলিয়ান লীগের দ্বিতীয় বিভাগের একটি দল। ২০০৯ সালের ২৪ অক্টোবর ১৮ বছর বয়সে পন্টে প্রেটার বিপক্ষে ফিরমিনোর অভিষেক হয়।

ফিগেইরেন্সের হয়ে অসাধারণ খেলার কারণে তিনি এক জার্মান স্কাউটের নজরে পড়েন। তার সহায়তায় ফিরমিনো সুযোগ পান জামার্ন লীগ বুন্দেসলিগার খ্যাতনামা ক্লাব হফেনহেইমে। পুরো পরিবারসহ ফিরমিনো পাড়ি জমান জার্মানীতে।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে হফেনহেইম ফিরমিনোকে চুক্তিবদ্ধ করে এবং এবং এর কয়েকমাস মাস পর মেইনজের বিপক্ষে তার অভিষেক হয়। প্রথম তিন মৌসুমে ৬০ ম্যাচে মাত্র ১৫ গোল এবং ৩টি অ্যাসিস্ট করতে সক্ষম হন তিনি।

তবে ফিরমিনো অালোচনায় উঠে অাসেন ২০১৩-১৪ মৌসুমে। এই মৌসুমে তিনি ৩৩ ম্যাচে ১৬ গোল আর ১১ অ্যাসিস্ট করেন। সেইসাথে নৈপূণ্যের স্বীকৃতিস্বরুপ সেই মৌসুমের “বুন্দেসলিগা ব্রেকথ্রু প্লেয়ার অব দ্য সিজন” অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন তিনি।

২০১৫ সালের ২৩ জুন হফেনহেইম ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ জায়ান্ট লিভারপুলের কাছে ফিরমিনোকে বিক্রি করতে সম্মতি প্রকাশ করে। এরপর ৪ জুলাই প্রায় ২৯ মিলিয়ন ডলার অর্থমূল্যের বিনিময়ে ফিরমিনো লিভারপুলে যোগ দেন।

৯ অাগস্ট স্টোক সিটির বনাম লিভারপুল ম্যাচের মধ্য দিয়ে প্রিমিয়ার লীগে তার অভিষেক হয়। লিভারপুলের হয়ে প্রথম মৌসুমেই দশটি গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার মর্যাদা অর্জন করেন তিনি।

২০১৭-১৮ মৌসুমকে ফিরমিনোর ক্যারিয়ারের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা যায়। এই মৌসুমেই ফিলিপে কৌতিনহো, মো সালাহ ও সাদিও মানের সাথে ফিরমিনো গড়ে তোলেন ‘ফ্যাবিউলাস ফোর যা সেই মৌসুমের সেরা অাক্রমণভাগ বলে স্বীকৃতি পায়। মাঝ মৌসুমে কৌতিনহো দল ছেড়ে দেয়ার পর ফিরমিনো-সালাহ-মানে ত্রয়ীকেফ্যাবিউলাস থ্রি‘ নামে ডাকতে শুরু করেন ফুটবলবোদ্ধারা। পুরো লীগ মৌসুমে এই অাক্রমণ ত্রয়ী মোট ৯১ টি গোল করে। মূলত তাদের কাধ ভর দিয়েই চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে ওঠে লিভারপুল। চ্যাম্পিয়নস লীগে মোট ১১টি গোল করে সালাহের সাথে যুগ্নভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন ফিরমিনো।

২০১৪ সালের ২৩শে অক্টোবর ফিরমিনো সর্বপ্রথম ব্রাজিল জাতীয় দলে ডাক পান। তাকে তুরস্ক এবং অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের জন্য দলে ডাকা হয়। একই বছরের ১২ই নভেম্বর তুরস্কের বিপক্ষে ১৭তম মিনিটে লুইজ অাদ্রিয়ানোর বদলি হিসেবে অভিষেক ঘটে তার। এরপর ২০১৫ সালের মে মাসে চিলিতে অনুষ্ঠিত ২০১৫ কোপা আমেরিকার জন্য ঘোষিত ২৩ সদস্যের ব্রাজিল দলে ডাক পান।

২০১৮ বিশ্বকাপটাও খুব একটা মন্দ যায়নি ফিরমিনোর। চলতি বছরের বিশ্বকাপে দ্বিতীয় পর্বে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের হয়ে একটি গোল করেন তিনি।

ব্যক্তিজীবন:

ফিরমিনো ২০১৫ সালে ব্রাজিলিয়ান মডেল ও অভিনেত্রী লারিসা পেরেইরার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। লারিসার সাথে তার পরিচয়ের সূত্রপাত ২০১৩ সালে একটি নাইটক্লাবে। লারিসার এবং ফিরমিনোর সংসারে ভ্যালেন্তিনা এবং বেলা নামে দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

ফিরমিনো নিজের শরীরে ট্যাটু অাঁকাতে পছন্দ করেন। তার শরীরে অসংখ্য ট্যাটু রয়েছে। এছাড়াও নিজের চুল নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে ভালোবাসেন তিনি।

খেলার ধরণ:

বর্তমানে লিভারপুলের হয়ে খেলা ফিরমিনোর জার্সি নাম্বার নাইন হলেও তিনি অন্যসব প্রথাগত স্ট্রাইকারের মতো নন। তিনি যে পজিশনে খেলেন, সেটিকে বলা হয় “ফলস নাইন“, যেখানে একজন স্ট্রাইকার কিছুক্ষণ পরপর মিডফিল্ডে নেমে এসে ডিফেন্ডারদের মার্কিং, বল ট্যাকল এবং প্লে মেকারের ভূমিকা পালন করেন। সে অর্থে ফিরমিনোকে একজন অ্যাডভান্সড অ্যাটাকিং মিড ফিল্ডার বা ট্যাকল ব্যাক স্ট্রাইকার বললেও ভুল হবেনা। মূলত লিভারপুল কোচ জার্গেন ক্লপের পরামর্শে এই ‘ফলস নাইন’ পজিশনে খেলতে শুরু করেন তিনি।

সহজাত সেলেকাও ড্রিবলিং দক্ষতা, বল কন্ট্রোল, থ্রু-পাস দেওয়ার ভিশন, শুটিং অ্যাবিলিটি, ৫ ফুট সাড়ে ১১ ইঞ্চির উচ্চতার সুবিধা সব মিলিয়ে ফিরমিনোকে বলা যায় একটি ‘কমপ্লিট প্যাকেজ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *