“বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না”
“যে ডাক্তার যত বড়ো, তার হাতের লেখা তত খারাপ”
“ওষুধ খেলে সর্দি সারে সাত দিনে, না খেলে এক সপ্তায়”

লোক হাসানো খুব একটা সহজ কাজ নয়। কিন্তু এই কালজয়ী উক্তিগুলো যিনি দিয়েছেন, লোক হাসানো ছিলো তার কাছে নস্যি। না, কোনো ভাঁড় বা কৌতুকাভিনেতা নয়, বলছি বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ সৈয়দ মুজতবা অালীর কথা। বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল তার রচনার মাধ্যমে পাঠককে শুধু হাসাননি, করেছেন ভাবতে বাধ্য।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

মুজতবার জন্ম ১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে আসামের অন্তর্ভুক্ত সিলেটের করিমগঞ্জে। পিতা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন একজন সাব-রেজিস্ট্রার। তার পৈতৃক নিবাস সিলেটের মৌলভীবাজারে।
সিলেটের গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন মুজতবা। পিতার ছিল বদলির চাকরি। তাই এক বিদ্যালয় থেকে অারেক বিদ্যালয়ে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন কেটে যায়। এরপর ১৯২১ সালে ভর্তি হন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর প্রথমদিকের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার নাম অগ্রগণ্য।
১৯২৬ সালে বিশ্বভারতী থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি পাড়ি জমান সেসময়কার ঐতিহ্যবাহী মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুদিন লেখাপড়া করার পর ১৯২৯ সালে ‘হুমবল্ট’ বৃত্তি নিয়ে চলে যান জার্মানি।


১৯৩২ সালে বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বে গবেষণার জন্য তিনি ডি.ফিল লাভ করেন । ১৯৩৪ সালে তিনি মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এরপর বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে তিনি বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। আট বছর অধ্যাপনা করে যোগ দেন দিল্লির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের খণ্ডকালীন প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পঞ্চাশের দশকে বেশ কিছুদিন কটক ও দিল্লিতে আকাশবাণীর স্টেশন ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে মুজতবা ফিরে অাসেন নিজের অাপন অালয়ে। পুরোনো ঠিকানা শান্তিনিকেতনে প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। বিশ্বভারতীর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অবসরগ্রহণ করেন।

সাহিত্যজীবন ও কর্ম

শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় সেখানকার হস্তলিখিত ম্যাগাজিনে লিখতেন মুজতবা। পরবর্তীতে ‘সত্যপীর’, ‘ওমর খৈয়াম’, ‘টেকচাঁদ’, ‘প্রিয়দর্শী’ প্রভৃতি ছদ্মনামে বিভিন্ন পত্রিকায়, যেমন : দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ, মোহাম্মদী প্রভৃতিতে কলাম লেখেন। বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন ভ্রমনকাহিনী। এছাড়াও লিখেছেন ছোটগল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা। কিন্তু মজার ব্যপার হলো, লেখালেখিতে তার ছিলো ঔদাসীন্য আর খামখেয়ালী। বলতেন, পকেটে পয়সা ফুরিয়ে গেলেই কলমই আমার উপার্জনের ভরসা।


গ্রন্থাকারে তাঁর মোট ত্রিশটি উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ ও ভ্রমণকাহিনী প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো: ভ্রমণকাহিনী দেশে-বিদেশে (১৯৪৯), জলে-ডাঙায় (১৯৬০); উপন্যাস অবিশ্বাস্য (১৯৫৪), শবনম (১৯৬০), শহ্র-ইয়ার (১৯৬৯); রম্যরচনা পঞ্চতন্ত্র (১৯৫২), ময়ূরকণ্ঠী (১৯৫২) এবং ছোটগল্প চাচা-কাহিনী (১৯৫২), টুনি মেম (১৯৬৪)
‘রসগোল্লা’ রম্য রচনাটিকে বলা যায় মুজতবার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। বন্ধুর মেয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া এক টিন ভ্যাকুয়াম প্যাকেটজাত মিষ্টি কীভাবে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ঝান্ডুদার বিপদের কারণ হয়ে দাড়ায়, তা রসাত্মক ভাবে বর্ণনা করেছেন তিনি। ইতালিয় কাস্টমস অফিসারের বাকবিতন্ডা, এপর্যায়ে মিষ্টির টিন খুলতে বাধ্য করা ও পরিশেষে মিষ্টি নাকে মুখে লেপে দেয়ার মতো পরিণতি যে কাউকে হাসতে বাধ্য করবে।
মুজতবা আলী কাজের খাতিরে ঘুরেছেন বহুদেশ। তার ‘দেশে-বিদেশে’ গ্রন্থটি কাবুল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির ফসল, যা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকচিত্ত জয় করতে সক্ষম হয়।


তার কল্পনাশক্তি ছিলো অসাধারণ। নারীরা পুরুষদের ওপর নির্যাতন করছে, এই থিমের ওপর ভিত্তি করে লেখেন ‘দাম্পত্য জীবন’। যেখানে অসহায় স্বামীদের ‘পুরুষ নির্যাতন বিরোধী সভা’ চলাকালে স্ত্রীদের ঝাটা-সমেত সভা পন্ড করতে অাসার খবর শুনে সাথে সাথে খালি হয়ে যায় সভাস্থল। একমাত্র সভাপতি সেখান থেকে না। এ পর্যন্ত পড়ে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কি সভাপতিই একমাত্র বীরপুরুষ? কিন্তু শেষে দেখা যায়, গিয়ে দেখল সভাপতি ভয়ে মারা গেছেন। সভাপতির চিরতরে পালানোটা করুনাত্মক হলেও না হেসে পারা যায় না।
তার বিখ্যাত ছোটগল্পগুলোর মধ্যে ‘চাচাকাহিনী’, ‘টুনি মেম’, ‘ধূপছায়া’, ‘রাজা উজির’, ‘বেঁচে থাক সর্দি-কাশি’, ‘তীর্থহীনা’, ‘পুনশ্চ’, ‘কর্ণেল’, ‘ক্যাফে-দি-জেনি’, ‘স্বয়ম্বরা’, ‘বেল তলায় দু-দুবার’, ‘রাক্ষসী’, ‘রসগোল্লা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
মুজতবা আলীর ডি.ফিল অভিসন্দর্ভ The Origin of Khojahs and Their Religious Life Today (১৯৩৬) বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর আরেকটি অনবদ্য গ্রন্থ পূর্ব-পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।

রসাত্মক মুজতবা

নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করতে পারার গুণটি উপস্থিত ছিল মুজতবার মাঝে। নানা ঘটনা থেকে তার তীক্ষ্ণ রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
তাঁকে একবার এক জার্মান পণ্ডিত জিজ্ঞেস করেছিলেন, শেক্সপীয়রের কোন লেখাটা আপনার ভালো লাগে? ঝটিকা উত্তর দিয়েছিলেন, হ্যামলেট! তারপর একটু চুপ করে থেকে বলেছিলেন, ঐ একটা বই-ই পড়েছি কিনা!
অারেকবার এক অনুষ্ঠানে এক হিন্দু পুরোহিত গীতা সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন মুজতবাও। দূর্ভাগ্যবশত পুরোহিত গীতা থেকে সংস্কৃত ভাষায় যে বক্তব্য দিচ্ছিলেন তাতে কিছু ভুল ছিল। মুজতবা অবশেষে দাঁড়িয়ে সমস্ত বক্তব্য মূল সংস্কৃত ভাষায় কী হবে তা মুখস্থ বলে গেলেন। দর্শকরা সব বিস্ময়ে থ!


আড্ডাবাজ এই মানুষটি যেকোনো আড্ডায় ঘন্টার পর ঘন্টা অনর্গল বলে যেতে পারতেন। একবার তার সাথে অাড্ডা দিয়ে এক রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি জীবনে এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর এত বিষয়ে আলাপ শুনি নাই, যেটা সৈয়দ মুজতবা আলী আমাকে শুনিয়েছিলেন অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে।’

সম্মাননা ও মৃত্যু

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি নরসিংহ দাস পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশে ২০০৫-এ তাঁকে একুশে পদক-এ ভূষিত করা হয়।
১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মুজতবা আলী মৃত্যুবরণ করেন।
জীবনে ঘটে যাওয়া নানা তুচ্ছ ঘটনাকে অবলম্বন করে মুজতবা গড়ে তুলেছেন অাপন ভুবন। জীবনের করুণ দিকগুলো সুস্পষ্টভাবে জানতেন বলেই হাস্যরসের দিকগুলো নিপুনভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন তিনি। তার “রসগোল্লা” যেমন ভারত পেরিয়ে ইতালি জয় করেছিল, তেমনিভাবে মুজতবার রসাত্মক জীবনবোধ জয় করে নিয়েছে সার্বজনীন পাঠক মন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *