১৯৯২-২০০৬, প্রায় ১৫ বছর ক্রিকেটবিশ্বকে নিজের কবজির মোচড়ে মনোমুগ্ধ করে রেখেছেন যিনি, তাঁর নাম শেন ওয়ার্ন। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে মাত্র ১ উইকেট পাওয়া এই লেগ স্পিনার ক্যারিয়ার শেষ করেন ১০০১টি আন্তর্জাতিক উইকেট নিয়ে। একসময়ের প্রায় হারিয়ে যাওয়া লেগ স্পিনকে আবারো ক্রিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা এই জীবন্ত কিংবদন্তির জীবনে বৈচিত্র্যে ভরপুর। অস্ট্রেলিয়াকে জিতিয়েছেন অসংখ্য ম্যাচ, তাঁর হাত থেকে বের হয়েছিল শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ডেলিভারি। আবার নিজের উচ্ছৃঙ্খল জীবনের জন্য বারবার হয়েছেন খবরের শিরোনাম। আলোচিত-সমালোচিত এই খেলোয়াড় ক্রিকেট মাঠে নিজের নিজস্ব ছাপ ফেলে গিয়েছেন।

জন্ম ও ক্রিকেটের সাথে বেড়ে ওঠাঃ

১৯৬৯-এর ১৩ সেপ্টেম্বর, অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের ফার্নট্রি গালিতে তাঁর জন্ম। স্থানীয় হ্যাম্পটন হাইস্কুলে পড়ার সময় মেন্টন গ্রামার স্কুল থেকে খেলোয়াড় কোটায় স্কলারশিপ পান। মেন্টনে ৩ বছর পড়ে ওয়ার্ন মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হোন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনূর্ধ্ব ১৬ ক্রিকেট দলে জায়গা করে নেন। সেসময়ে ওয়ার্ন লেগ স্পিনের পাশাপাশি অফ স্পিনও করতেন এবং শেষের দিকে মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর নাম ছিল।

তারপর ওয়ার্ন সেন্ট কিলডা ক্রিকেট ক্লাবে যোগ দেন। প্রথম কয়েক বছর অনূর্ধ্ব দলগুলোতে খেলার পর তিনি মূল একাদশে জায়গা পান। ক্রিকেটের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবল খেলাতেও পারদর্শী ছিলেন ওয়ার্ন। ১৯৮৮ সালে ওয়ার্ন সেন্ট কিলডা ফুটবল ক্লাবের মূল একাদশের রিজার্ভ বেঞ্চে জায়গা পেয়ে ছিলেন। কিন্তু একইবছর তাকে রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে সরিয়ে দেয়া হলে শুধু ক্রিকেট খেলায় মনোনিবেশ করার সিদ্ধান্ত নেন ওয়ার্ন।
১৯৯০ সালে ওয়ার্ন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট একাডেমিতে ডাক পান ট্রেনিং-এর জন্য।

১৯৯১ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক ম্যাচে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ভিক্টোরিয়ার হয়ে ১০২ রানের খরচায় দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র একটি উইকেট পান ওয়ার্ন। তারপর অস্ট্রেলিয়া-বি দলের জিম্বাবুয়ে সফরে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রথমবারের মত এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেন তিনি। এরপর অস্ট্রেলিয়া-এ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-এর বিপক্ষে দুই ইনিংসে ৭ উইকেট লাভ করে ওয়ার্ন অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সেসময়ে চলতে থাকা অস্ট্রেলিয়া-ভারত টেস্ট সিরিজের প্রথম ২ ম্যাচে নিয়মিত স্পিনার পিটার টেইলরের খারাপ প্রদর্শনের কারণে সিডনিতে সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে একাদশে সুযোগ পান ওয়ার্ন। ২ জানুয়ারি, ১৯৯২, প্রথমবারের মত অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাঠে নামেন শেন ওয়ার্ন ।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকঃ

মাত্র ৭টি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেই জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া ওয়ার্নের আন্তর্জাতিক অভিষেক সুখকর ছিল না। সিডনি টেস্টে ১৫০ রান দিয়ে মাত্র ১ উইকেট পান ওয়ার্ন। অ্যাডিলেডে অনুষ্ঠিত পরবর্তী টেস্ট আরো পারফরম্যান্স আরো হতাশাজনক। ৭৮ রান দিয়ে উইকেটশূণ্য। সিরিজের ৫ম টেস্টে দল থেকে বাদ পড়ে যান ওয়ার্ন।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী সফরে আবারো দলে সুযোগ পান। ১ম টেস্টের ২য় ইনিংসে ৩ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচ জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন ওয়ার্ন। কিন্তু বাকি ম্যাচগুলোতে পারফরম্যান্স ভালো না হওয়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের ১ম ম্যাচে আবারো দলের বাইরে চলে যান তিনি। ২য় ম্যাচে আরো একটি সুযোগ পান এবং এবার ওয়ার্ন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মত ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেন। এরপরেই আসে ওয়ার্নের ক্যারিয়ারের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ, ১৯৯৩-এর অ্যাশেজ। যেখানে তিনি করেন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বল।

বল অফ দ্যা সেঞ্চুরিঃ

 

ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথমবারের মত অ্যাশেজ খেলতে এসেছিলেন শেন ওয়ার্ন। তাঁর অ্যাশেজ অভিষেকের প্রথম বলটিই ক্রিকেট ইতিহাসে স্থান করে নেয়। স্ট্রাইকে ছিলেন মাইক গ্যাটিস। ওয়ার্ন তাঁর স্পেলের প্রথম বল করতে আসলেন। মনে হল যে বলটা তাঁর হাত থেকে ফসকে গেছে, বল পিচ করল লেগ স্ট্যাম্পেরও অনেক বাইরে। মাইক গ্যাটিস নিশ্চিত ছিলেন যে এই বলটা তার কোনো বিপদ ডেকে আনতে পারবে না। কিন্তু তারপর হল সবথেকে আশ্চর্য এক ঘটনা। বলটা লেগ স্ট্যাম্পের অনেক বাইরে ড্রপ করে ব্যাটসম্যান গ্যাটিসে চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে তার অফ স্ট্যাম্পের বেলে আঘাত হানল। মাঠের খেলোয়াড়, ধারাভাষ্যকার এবং সমর্থকরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। গ্যাটিস কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন কি হল বুঝবার জন্য। একমাত্র শেন ওয়ার্নকে দেখা গেল প্রচন্ড গর্জনের সাথে জানান দিচ্ছেন নিজের কীর্তিকে। তাঁর সেই গর্জনে ভবিষ্যতের এক মহা তারকাকে দেখে নিয়েছিল ক্রিকেট বোদ্ধারা। ক্রিকেট ইতিহাসে এখনো মাইক গ্যাটিসকে করা সেই বলকে ‘বল অফ দ্যা সেঞ্চুরি’ বলে মান্য করা হয়।

তারপর থেকেই যেন ক্রিকেট মাঠে নিজের আধিপত্যের সূচনা করেন ওয়ার্ন। ১৫ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ওয়ার্ন গড়েছেন অসংখ্য রেকর্ড, জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার। তাঁর ক্রিকেট মাঠের উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন তুলে ধরা হল-

ওয়ার্নের কীর্তিঃ

  • টেস্ট ইতিহাসের ২য় সর্বোচ্চ (৭০৮) উইকেট শিকারি বোলার।
  • আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১ হাজারের অধিক (১০০১) উইকেট শিকারি বোলারদের মধ্যে একজন।
  • অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপ জয়। টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২০ উইকেট লাভ এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনালে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ পুরস্কার পাওয়া।
  • তাঁর খেলা ৮টি অ্যাশেজের মধ্যে ৭টি জয় করা।
  • টেস্ট ক্রিকেটে কোনো সেঞ্চুরি না করে ৩০০০+ রান করা একমাত্র ব্যাটসম্যান।
  • উইজডেন ক্রিকেটারস অফ দ্যা সেঞ্চুরি-র পাঁচজনের মধ্যে একজন।
  • আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০০০ উইকেট এবং ৪০০০+ রান করা একমাত্র খেলোয়াড়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরঃ

 

ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের সমাপ্তির পরে দর্শকদের অভিবাদন জানাচ্ছেন শেন ওয়ার্ন।

২০০৩ সালে বিশ্বকাপ খেলে ওয়ানডে থেকে অবসর নিতে চেয়েছিলেন ওয়ার্ন। কিন্তু ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ  হওয়ায় তাঁকে বিশ্বকাপের মাত্র ১ দিন আগেই দেশে ফিরে যেতে হয়। এভাবেই ৫০ ওভারের ফরম্যাট থেকে একপ্রকারে নিরবাসিত হয়ে পড়েন ওয়ার্ন। 

১ বছর সাজা কাটানোর পরে ২০০৪ সালে আবারো টেস্ট ক্রিকেটে ফিরে আসেন ওয়ার্ন। ২০০৬ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেট চালিয়ে যান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১ হাজার এবং টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম বোলার হিসেবে ৭০০ উইকেট লাভ করেন। ২০০৬ সালের অ্যাশেজই ছিল অস্ট্রেলিয়ার হয়ে  তাঁর শেষ খেলা। যেখানে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল, সেই সিডনিতেই তিনি তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলেন। সিরিজটি অস্ট্রেলিয়া ৫-০ ব্যবধানে জিতে নেয়। এক বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটে।

কিন্তু ওয়ার্ন আরো কিছু বছর ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যান। আইপিএল-এর প্রথম আসরে তিনি একাধারে রাজাস্থান রয়ালস-এর কোচ ও ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দল আইপিএল-এর প্রথম আসরের ট্রফি ঘরে তোলে। ২০০৮-২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি রাজস্থানের হয়ে আইপিএল-এ অংশগ্রহণ করেন।

আইপিএল-এ শেন ওয়ার্ন

 ২০১১-২০১৩ সাল পর্যন্ত ওয়ার্ন অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশ লিগে মেলবোর্ন স্টারস-এর হয়ে মাঠ মাতান। ২০১৩ সালে সকলধরনের ক্রিকেট থেকে অবসরগ্রহণ করেন ওয়ার্ন।

ওয়ার্ন শুধুমাত্র একজন বড় মাপের খেলোয়াড় হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন না। ক্রিকেটে তাঁর প্রভাব তাঁর খেলোয়াড়ি কৃতিত্বগুলো থেকেও বেশি। তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণের সময়ে ক্রিকেটে চলছিল ফাস্ট বোলারদের জয়জয়কার। পাকিস্তানি বোলার আব্দুল কাদিরের পরে লেগ স্পিনাররা যেন হারিয়ে যাচ্ছিল দৃশ্যপট থেকে। শেন ওয়ার্নের আবির্ভাব এই প্রেক্ষাপটকে পাল্টে দেয়। এখন টেস্ট ক্রিকেটের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির প্রথম ৩জনের সকলেই স্পিনার। তাঁকে আদর্শ মেনে বর্তমানের লেগস্পিনাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাই ক্রিকেট খেলাটা যতদিন থাকবে, শেন ওয়ার্নকেও ততদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *