তার ইচ্ছা ছিলো প্রাণীবিজ্ঞানী হবেন, ঝোঁক পাল্টে সিদ্ধান্ত নিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা হবার। স্বপ্ন পূরণের অাকাঙ্ক্ষা নিয়ে পা রাখলেন বোম্বাইয়ে। করেছেন স্ক্রিপ রাইটিং, রিডিং এমনকি ক্যাফের ওয়েটারের কাজ। তার প্রথম ছবিটি মুক্তি পায়নি, দ্বিতীয়টিও ছিলো ব্যবসা-অসফল। মানুষটা ডুবে গিয়েছিলেন অাকন্ঠ মদ, ঋণ অার বিষন্নতায়।

অামার-অাপনার মতো কেউ হলে এতটুকু এসেই হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু এটাতো অামার অাপনার গল্প নয়। এটা এক সংগ্রামের গল্প। এটা একটা নাছোড়বান্দার গল্প, যে কখনো হাল ছেড়ে দিতে শিখেনি। তাই বারবার হোঁচট খেয়েও সে উঠে দাড়িয়েছে নির্ভীকচিত্তে।

হ্যা, পাঠকগণ, বলিউডের পোড়খাওয়া পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপের কথাই বলছি অাজ। যে মানুষটি তার চলচ্চিত্র দ্বারা দাগ কেটেছেন মানুষের মনে, তার জীবনের কাহিনীটাও মনে দাগ কাটবার মতোই!

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

অনুরাগ কাশ্যপের জন্ম ১৯৭২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের গোরাকপুরে। বাবা শ্রী প্রকাশ সিং ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত চিফ ইন্জিনিয়ার।

অনুরাগের পড়ালেখার সূচনা দেরাদুনে অব্সথিত গ্রীন বিদ্যালয়ে। অাট বছর বয়স পর্যন্ত পড়ালেখা করে তিনি ভর্তি হন গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া বিদ্যালয়ে।

ছোটবেলা থেকেই অনুরাগের স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে খ্যাতনামা একজন বিজ্ঞানী হবেন। তাই উচ্চশিক্ষার নিমিত্তে ভর্তি হন দিল্লির হংসরাজ কলেজে প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৯৩ সালে গ্র্যাজুয়েশন সমাপ্ত করেন অনুরাগ। সবাই ভেবেছিল, অনুরাগ হয়তো প্রাণী বিজ্ঞানী হতে চলেছেন, কিন্তু বিধাতার অভিপ্রায় ছিলো অালাদা।

যেভাবে অাসলেন বলিউডে

নিজের বলিউডে আসার পেছনের কাহিনি নিয়ে ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে দিল্লীর ঠাগয়ারাজ স্টেডিয়ামে ‘Josh Talks-এর মোটিভেশনাল স্পিচের অনুষ্ঠানে সবিস্তারে কথা বলেন তিনি।  

বলিউডে তাঁর যাত্রার সূচনা হয় ১৯৯৩ সালের জুন মাসে। কিছু জামাকাপড় আর ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে বোম্বাইয়ে পাড়ি জমান অনুরাগ। তার চোখে চিকচিক করছে নতুন কিছু করার স্বপ্ন। সিনেমা নির্মাতা হওয়ার স্বপ্ন।

কিন্তু বোম্বাইয়ে পৌছে অনুরাগ পড়লেন এক বিপদে। এসে তো পড়েছেন, কিন্তু রাস্তাঘাট চেনেন না কিছুই। সম্বল কেবল একটি ঠিকানা। পৃথ্বী থিয়েটার। রূপালী পর্দার সামনে আর পর্দার আড়ালে কাজ করতে চাওয়া স্বপ্নচারীদের মিলনমেলা এ পৃথ্বী থিয়েটার। হুট করে এখানে জায়গা করে নেয়া সহজ কাজ নয়। জায়গা করে নেয়া তো দূরের কথা, পৃথ্বী থিয়েটারে ঢোকারই সুযোগই পেলেন না তিনি। কিন্তু এখানে ঢুকতে তো তাকে হবেই, এর জন্যই তো গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেও নিজের ক্যারিয়ারের ইতি টেনে ছুটে এসেছেন এখানে।

অনুরাগের মাথায় এক বুদ্ধি খেলে গেল। তিনি সোজা চলে গেলেন থিয়েটারের ক্যাফেতে। ক্যাফের মালিককে বললেন, তিনি এখানে ওয়েটার হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছুক। জবাব এলো, ওয়েটারের দরকার নেই। অনুরাগ নাছোড়বান্দা। তিনি জানালেন পারিশ্রমিক ছাড়াই কাজ করবেন তিনি।

পৃথ্বী থিয়েটার

 

ফ্রিতে কাজ করে দেয়ার লোভনীয় প্রস্তাব কেই বা ছাড়ে? অনুরাগও পেয়ে গেলেন পৃথ্বী থিয়েটারে ঢোকার সুযোগ। শুরু হলো তার নতুন জীবন। পৃথ্বী থিয়েটারে নিয়মিত প্রচুর রিহার্সাল হতো। সেখানে স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনানোর জন্য সবসময় কাউকে না কাউকে প্রয়োজন পড়তো। অনুরাগ সে কাজটা করে দিতেন, তাও কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই! শুধু স্ক্রিপ্ট পড়া নয়, সামনে যা পেতেন তা-ই করতেন তিনি। স্টেজ ঠিক করা থেকে শুরু করে স্ক্রিপ্ট লেখা পর্যন্ত।
অনুরাগের সবচেয়ে বড় দক্ষতা ছিল দ্রুত লিখতে পারা। দিনে একশ পৃষ্ঠার মতো লিখে ফেলতে পারতেন তিনি। এসময় স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোতে ধারাবাহিক নাটক তৈরি করার হিড়িক পড়ে। তিনি তাদের জন্য স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু করলেন, কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই।

সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি পাল্টাতে লাগলো। ‘ত্রিকাল’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকে ডায়লগ রাইটার হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন তিনি। এটাই প্রথম স্বীকৃতি!

চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা:

এরপর এলো অনুরাগের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্ত। বলিউডের বিখ্যাত প্রযোজক মহেশ ভাট অনুরাগকে প্রস্তাব দেন, ‘কাভি কাভি’ নামের একটি ধারাবাহিক নাটকের কাহিনী লিখে দেয়ার জন্য। মাত্র এক মাসের চুক্তিতে তাকে আড়াই লক্ষ টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়। এদিকে প্রখ্যাত চিত্রকার রাম গোপাল ভার্মা প্রস্তাব দেন ‘সত্য’ চলচ্চিত্র লিখে দেয়ার জন্য। সেখানে চুক্তি ছিল, প্রতি মাসে মাত্র দশ হাজার টাকা করে দশ মাসে এক লক্ষ টাকার।

১৯৯৫ সালে বাইশ বছর বয়সী একটি ছেলের পক্ষে আড়াই লক্ষ টাকার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করা খুবই কঠিন ব্যাপার। কিন্তু অনুরাগ কাশ্যপ তো টাকার জন্য এখানে আসেননি। এসব তো তার স্বপ্ন নয়। তার ভেতরের ক্ষুধাটা হলো ফিল্ম বানানোর। অার রাম গোপাল ভার্মা তার কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, কারণ তিনি এমন একজন পরিচালক, যার জীবন জুড়েই শুধু চলচ্চিত্র। তাই আর্থিকভাবে লাভবান না হলেও, তিনি রাম গোপাল ভার্মার প্রস্তাব গ্রহণ করলেন।

১৯৯৮ সালে মুক্তি পেল ‘সত্য’। অনুরাগের মনে আবার পুরানো স্বপ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। যে ধরনের চলচ্চিত্র বানানোর স্বপ্ন নিয়ে তিনি এসেছেন বলিউডে। কিন্তু বলিউড সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি তখন মোটা দুই দাগে বিভক্ত। এক, নায়ক-নায়িকা, নাচ-গানে ঠাসা ব্যবসায়িক চলচ্চিত্র, যেগুলো কেবল সস্তা বিনোদন যোগানোর জন্যই তৈরী। আর কিছু আর্ট-ফিল্ম, যেগুলো অ্যাওয়ার্ড কুড়াবার জন্য বানানো হত, সিনেমা হলে কখনো মুক্তিই পেতো না।

অনুরাগের চলচ্চিত্র এ দু’ধরনের কোনোটার মধ্যেই পড়ে না। তাই তাকে বিশ্বাস করে চলচ্চিত্রে অর্থ লগ্নি করবে কে? কিন্তু অনুরাগ নাছোড়বান্দা। কোনো নামকরা তারকা, স্টুডিও, শুটিং স্পট, ক্যামেরা ছাড়াই শুরু করে দিলেন চলচ্চিত্রের কাজ। এভাবে নির্মিত হলো তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘পাঁচ’ (Paanch)। বলা চলে, তিনি এমন কোনো কৌশল বাদ দেননি, যা দ্বারা কম খরচে একটি বড় চলচ্চিত্র তৈরি করা সম্ভব।

কিন্তু ভারতীয় সেন্সর বোর্ড চলচ্চিত্রটিকে ছাড়পত্র দিতে অস্বীকৃত জানালো। তাদের বক্তব্য অনুরাগের চলচ্চিত্রটি ‘না বিনোদনমূলক, না স্বা‌স্থ্যকর’। তাই ছাড়পত্র দিতে রাজি হলোনা তারা। চলচ্চিত্রটি অার মুক্তি পেলোনা। অনুরাগ হতাশ হলেন না। শুরু করলেন নতুন সিনেমা ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ এর কাজ, যা মুম্বাই বিস্ফোরণের উপর ভিত্তি করে রচিত। কিন্তু ঝামেলা অনুরাগের পিছু ছাড়লোনা। ভারতীয় অাদালতে ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’ নিষিদ্ধ হলো। মুক্তি না পেলেও এর পাইরেটেড সিডি ছড়িয়ে পড়ল। অনেক জল ঘোলা করবার পর, ২০০৭ সালে মুক্তি পেল ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’।

অনুরাগ কাশ্যপের পরবর্তী চলচ্চিত্র ছিল ‘নো স্মোকিং’। স্টিফেন কিং এর ‘কুইটার্স’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি বিদেশে অনেক অ্যাওয়ার্ড পেলেও, ভারতে ব্যবসায়িক দিক থেকে মুখ থুবড়ে পড়লো।

তবে সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার পরবর্তী সিনেমার অনেকগুলোই সফলতার মুখ দেখেছে। নিজেকে লেখক, পরিচালক প্রযোজক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন বলিউডে। নির্মাণ করেছেন ‘আগলি’, ‘দেব ডি’, ‘গুলাল’, ‘গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর’, ‘রমন রাঘব ২’ এর মতো অসাধারণ সব চলচ্চিত্র।

২০১৮ সাল অনুরাগ কাশ্যপের জন্য সেরা একটি বছর। এবছর তার দুটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। এছাড়াও ‘Manmarziyaan’ নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পাবে এ বছরই।

চলচ্চিত্র বাদেও Sacred Games নামে একটা টিভি সিরিজ পরিচালনা করেছেন তিনি। Sacred Games ইতোমধ্যে ভারতের সেরা টিভি সিরিজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

অনুরাগ বলিউডের একজন নামকরা প্রযোজকও। তিনি Aamir, Shaitan, Trishna, Michael, Shahid, Aiyyaa, Monsoon Shootout, The Lunchbox, Queen, NH10, Hunterrr, Masaan, Trapped, চলচ্চিত্রগুলো প্রযোজনা করেছেন। এছাড়া আকিরা চলচ্চিত্রে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।

অনুরাগের উল্লেখযোগ্য কাজ:

Paanch (Unreleased), Black Friday (2007), No Smoking (2007), Return of Hanuman (2007), Dev.D (2009), Gulaal (2009), Mumbai Cutting (2010), That Girl in Yellow Boots (2011), Gangs of Wasseypur (2012), Bombay Talkies (2013), Ugly (2014), Bombay Velvet (2015), Raman Raghav 2.0 (2016), Mukkabaaz (2018), Lust Stories (2018), Sacred Games (2018), Manmarziyaan (2018)

পারিবারিক জীবন:

অনুরাগের ভাই অভিনব কাশ্যপও একজন চিত্র-নির্মাতা। এছাড়া তার বোন অনুভূতি কাশ্যপ তার কিছু চলচ্চিত্রে সহকারীর ভূমিকা পালন করেছেন।

সাবেক স্ত্রী কল্কি কোচেলিনের সাথে অনুরাগ

সংসার জীবনে অনুরাগ প্রথমে বিয়ে করেন চিত্র-নির্মাতা অারতি বাজাজকে। ২০০৯ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। অনুরাগ-অারতির সংসারে একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। একই বছর ডেভ-ডি চলচ্চিত্রের সুবাদে অনুরাগের সাথে অভিনেত্রী কল্কি কোচেলিনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিবাহ বন্ধনেও অাবদ্ধ হন তারা। কিন্তু ছয় বছর সংসারের পর বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন দুজনে।

শত বাধা-বিপত্তি অার ব্যর্থতার পরও অনুরাগ কাশ্যপ থেমে থাকেননি। তার স্বপ্ন ছিলো বলিউডের গৎবাঁধা চলচ্চিত্রের ধরনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে নিজের মনমতো চলচ্চিত্র নির্মাণ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে না পারলে অন্য কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই। নিজের স্বপ্ন সফল করতে হলে নিজেকেই দায়িত্ব নিতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। দর্শকের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন না তিনি, বরং তার চলচ্চিত্র দর্শকের হৃদয়কে আঘাত করে, তীব্র অস্বস্তিতে ভোগায়। মানুষের, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উঠে আসে তার ক্যামেরায়।

তিনি সবসময় বলেন-

“My films don’t touch anyone’s heart, I like to stab people’s heart. I like to make people uncomfortable.”

বর্তমানে বলিউডের অন্যতম সেরা পরিচালক হিসেবে প্রথমদিকেই আসে তার নাম। তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তিনি নিজের স্বপ্নের স্বার্থক রূপায়ন করেছেন, স্ব‌প্নবাজদের জন্য হয়ে উঠেছেন অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *