“দ্য ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া” বইটি ভারতের প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কর্তৃক লিখিত। 
বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”-র ন্যায় এ বইটির ও জন্ম নেহরুর কারাবাসকালে। ১৯৪৪ সালে আহমেদনগর দূর্গের কারাগারে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে থাকাকালীন তিনি বইটি লিখতে শুরু করেন।

কারাবাসের সঙ্গী হিসেবে রাজনৈতিক সহবন্দীদের উৎসর্গ করা বইটি বিভক্ত দশটি পরিচ্ছদে। পরিচ্ছদগুলো মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের আদি ইতিহাস ও সংস্কৃতির সূচনা ও ধীরে ধীরে তার নানা উত্থান পতনের ব্যাপক আলোচনায় সমৃদ্ধ।

তবে শুধু ইতিহাস রচনাতেই লেখক সীমাবদ্ধ থাকেননি, নিজের ব্যক্তিগত জীবনকেও নানা আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। স্ত্রী কমলা ও প্রিয় কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর বর্ণনা উঠে এসেছে বারংবার, স্ত্রীর অসুস্থতা ও মৃত্যুর সময়গুলোর দিনলিপি বর্ণনা করেছেন নিপুণতার সাথে।

তবে তাঁর মূল আলোচনা অতীত ভারতের ছবি অন্বেষণ শুরু করেন বইয়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদ থেকে। ভারতবর্ষের অতীত গৌরব ও বৈশিষ্ট্যের পেছনে কি শক্তি কাজ করেছে এবং সে শক্তি হারালোই বা কি করে তা শনাক্ত করা ছিলো তাঁর রচনার প্রথম কিছু পরিচ্ছদের অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয়। এছাড়া তিনি বিস্তৃত আলোচনা করেছেন সিন্ধু সভ্যতার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও সমসাময়িক অন্যান্য সভ্যতার সাথে তুলনা ও পার্থক্য।

বইটিতে আরো আছে আর্যদের আগমন কি করে প্রাচীনকালে এ অঞ্চলের ধর্ম চিন্তা, দর্শন, জীবন ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে তার পর্যালোচনা।জাতিভেদের আরম্ভ নিয়েও দাঁড় করিয়েছেন নিজস্ব ব্যাখা।

মহাভারত, গীতা ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের নানা দিক উল্লেখিত হয়েছে বইটিতে। এর পরবর্তী পরিচ্ছেদগুলো মূলত মৌর্য, গুপ্ত সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। সম্রাটদের সংস্কৃতিতে অবদান, বৌদ্ধধর্মের উত্থান, হিন্দুধর্মের উপর বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কোন বিষয়ই তাঁর ব্যাখার সীমানার বাইরে যায় নি।

আরবদের আগমন, রাজত্ব ও ধীরে ধীরে বিজ্ঞানসম্মত বিধিব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে ভারতবর্ষ কেন পশ্চিমা অঞ্চল থেকে পিছিয়ে পড়ল এ অংশটিও ব্যাখা করা হয়েছে নিপুণভাবে।

এ পর্যায়ে ব্রিটিশ শাসনের গোড়াপত্তন ও স্বদেশী আন্দোলনের সূত্রপাত অংশ থেকে নেহরু নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের গড়ে ওঠা আর পথচলার চড়াই উতরাইয়ের বর্ণনা দেন বিস্তৃত কলেবরে।

এছাড়া মুসলিম লীগের উত্থান, তাদের কংগ্রেস এর সাথে মতপার্থক্য, ফলশ্রুতিতে দাঙ্গা এসব তিনি বইয়ে তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে।

বইয়ের শেষ দিকে আলোচিত হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতবর্ষের রাজনীতি ক্ষেত্রে তার প্রভাব। যেহেতু লেখাটির সময়কাল ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত, সেহেতু ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আসবে কি না ও আসলেও দ্বিজাতি তত্ত্বে সেটি বিভক্ত হবে কিনা এমন একটা দ্বন্দ্বের মধ্যস্থলে রচনাটি শেষ হয়েছে।

বইটির বিশেষত্ব হচ্ছে পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর অসম্ভব প্রাজ্ঞ লেখনী ও প্রখর যুক্তিবোধে শাণিত মনের প্রতিচ্ছায়া, যা পাওয়া যায় বইটির পরতে পরতে। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানসিকতাসম্পন্ন, তাই কোন দল, মত বা ধর্মের প্রতি পক্ষপাত, অনুরাগ বা বিরাগ দেখা যায়নি তাঁর রচনায়, সূক্ষ্ম তুলাদণ্ডে ভালো মন্দের বিচার করেছেন তিনি। এমনকি নিজ মতাদর্শের বিরোধী কাউকে, যেমন: মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কারো সম্পর্কেই বিষোদগার বা ব্যক্তি আক্রমণ করেননি তিনি। এতটাই সততার পরিচয় দিয়েছেন যে তিনি রচনায় মহাত্মা গান্ধীর কিছু নীতির সমালোচনা করতেও কুণ্ঠিত হননি!

স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু

এছাড়া বইয়ে নেহরুর নিজস্ব যুক্তিবোধ ও বিস্তীর্ণ জ্ঞানের পরিধির ছাপ সর্বত্র। তাঁর নিজস্ব ব্যাখা চিন্তার খোরাক ও দৃষ্টিভঙ্গির নতুন দুয়ার খুলে দেয়। অনুবাদ ও অত্যন্ত সাবলীল কখনো একঘেঁয়েমিজনিত সমস্যা দেখা দেয়নি।

ইতিহাস ব্যাপারটা যে এতো চমৎকারভাবে, ব্যতিক্রমী দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা যায় তা এ বইটি না পড়লে জানা হতো না। যারা এ উপমহাদেশের তথা নিজের শেকড়ের আদি সামাজিক, রাজনৈতিক ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনায় আগ্রহী তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এ বইটি।

ব্যক্তিগত জানার পরিধি অনেকখানি সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখবে এ বইটি আমি নিশ্চিত। হ্যাপি রিডিং!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *