১৯৪২ সালের সোভিয়েত ইউনিয়ন। শত্রু জার্মান নাৎসি বাহিনী তখন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোর দিকে। সেই সময়ে জার্মানদের প্রতিহত করার জন্য দুঃসাহসী নারী পাইলটদের নিয়ে গঠিত হয় ৫৮৮ রেজিমেন্ট। এই রেজিমেন্টের কাজ ছিল রাতের অন্ধকারে শত্রুপক্ষের ক্যাম্পের উপর বোমা বর্ষণ করা। রাতের অন্ধকারে, প্লাই উডের তৈরি দুই আসনের বিমানে চড়ে, প্রচন্ড শীত মোকাবিলা করে এবং শত্রুপক্ষের প্রবল গোলাবর্ষণের মুখোমুখি হয়ে এই স্কোয়াড্রন তাদের অভিযান সম্পন্ন করত। রাতের আধারে তাদের অতর্কিত হামলার আশঙ্কায় ভীত সন্ত্রস্ত থাকত জার্মান নাৎসিরা। তাই ৫৮৮ রেজিমেন্টের নারী পাইলটরা বনে গিয়েছিল নাৎসি বাহিনির কাছে ‘রাতের ডাইনি’। 

এই স্কোয়াড্রনের পেছনের প্রধান কারিগর ছিলেন মারিনা রাস্কোভা তাকে বলা হত সোভিয়েত ইউনিয়নের এমিলিয়া এয়ারহার্ট। মারিনা একইসাথে ছিলেন প্রথম সোভিয়েত নারী নেভিগেটর এবং একজন সফল বিমান চালক। ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁর কাছে চিঠি পাঠায় অসংখ্য সোভিয়েত নারী। তাদের প্রত্যেকের একটাই চাওয়া, সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। সেইসময়ে নারীরা বিমানযোগে প্রয়োজনীয় রসদ আনা নেয়া করতে এবং আহতদের চিকিৎসা করতে যুদ্ধে পুরুষদের সাহায্য করতে পারত। কিন্তু তাদেরকে সম্মুখ সমরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হত না। রাস্কোভা তৎকালীন সোভিয়েত স্বৈরশাসক জোসেফ স্তালিনের কাছে নারীদের জন্য একটি পৃথক স্কোয়াড্রন তৈরি কয়ার জন্য পিটিশন করেন। তারই ফলস্বরূপ ১৯৪১ সালের ৮ অক্টোবর স্তালিন শুধুমাত্র নারী পাইলটদের নিয়ে ৩টি ইউনিট গঠনের নির্দেশ দেন।

মারিনা রাস্কোভা

দুই হাজারের অধিক সোভিয়েত নারী আবেদন করেন এই ইউনিটের সদস্য হওয়ার জন্য। আবেদনকারীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ১৭-২৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থী। যাদের মধ্য থেকে রাস্কোভা প্রতি ইউনিটের জন্য ৪০০ জন করে মোট ১২০০ জনকে বাছাই করেন। বাছাইকৃতদের নিয়ে যাওয়া হয় এঙ্গেলস নামের এক ছোট শহরে। সেখানে তাদেরকে কয়েক মাসের মধ্যে বিমানযোগে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য তৈরি করা হয়।

নারীদের দিয়ে তৈরি এই দলকে অনেকেই ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। সামরিক বাহিনীর অধিকাংশের চোখে যুদ্ধের মত এক পুরুষালি কাজে নারীদের কোনো স্থান ছিল না। একপ্রকার অবজ্ঞার সাথেই তাদেরকে দেয়া হয় দুই আসনের এবং কোনো ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি বিহীন পলিকারপভ মডেলের বিমান। প্লাইউডের তৈরি এই পলিকারপভ বিমান কোনো যুদ্ধবিমান না। তাই বিমানটিতে শত্রুদের উপর গোলাবর্ষনের জন্য কোনো ধরনের অস্ত্রের ব্যবস্থা ছিল না। বিমানটি প্লাইউডের তৈরি হওয়ায় সেটাতে শত্রুপক্ষের গুলিতে অনেকসময় আগুন ধরে যেত। পাইলটের ককপিটের উপর কোনো ছাউনি না থাকায় পাইলটকে প্রচন্ড ঠান্ডা ও হিমশীতল বাতাসের মধ্যে বিমান চালনা করতে হত।

নারী পাইলটরা বিমান চালনার জন্য পুরুষ পাইলটদের পরিত্যক্ত জামা এবং বুট ব্যবহার করত। তাঁর পাশাপাশি তাদের সহ্য করতে হত পুরষ পাইলটদের অবজ্ঞা।

পুরোনো এবং খুবই হালকা বিমান হওয়ায় রাডার, রেডিও, প্যারাসুটের মত অতিরিক্ত ভারী দ্রব্য পাইলটেরা বহন করতে পারত না। তাদেরকে রাতের অন্ধকারে কম্পাস, ম্যাপ, টর্চলাইটের সাহায্যেই বিমান চালনা করতে হত।

কিন্তু এই হালকা বিমান চালনা করা তাদের জন্য শাপেবর হয়ে যায়। নাৎসি যুদ্ধ বিমানের নুন্যতম গতি পলিকারপভের সর্বোচ্চ গতি থেকে বেশি ছিল। তাই সোভিয়েত নারীরা নাৎসিদের থেকে আরো ভালোভাবে তাদের বিমানের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। কিন্তু তারপরও নাৎসি যুদ্ধবিমান কিংবা অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রর সাথে পেরে ওঠা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল। তাই ৫৮৮ রেজিমেন্টের পাইলটরা আক্রমণ করার জন্য বেছে নিল রাতের বেলাকে।

প্রতি রাতেই ৪০টি বিমান অভিযান পরিচালনা করত। প্রতিটি বিমান পরিচালনা করার দায়িত্বে থাকত দুইজন করে নারী। একজন পাইলট ও অন্যজন নেভিগেটর। প্রতিটি বিমান দুই পাখাতে একটি করে মোট দুইটি বোমা বহন করত। বোমার ওজনের কারণে বিমানগুলো অনেক নিচে দিয়ে উড়তে হত, যা তাদের জন্য অনেক বিপজ্জনক ছিল। কিন্তু পলিকারপভ বিমানের ছোট আকৃতির কারণে এবং রাডার, রেডিও-এর অনুপস্থিতির কারণে জার্মান রাডারে তারা কখনোই ধরা পড়ত না।

৫৮৮ রেজিমেন্টকে ‘Night Witches’ বা ‘রাতের ডাইনি’ বলে ডাকত জার্মান সেনারা। এর পেছনের কারণ ছিল তাদের অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি। ধীরগতির বিমান হওয়ায় পলিকারপভ চলত প্রায় নিঃশব্দভাবে। তাদের আগমণের একমাত্র সংকেত ছিল মৃদু বাতাসের শব্দ। রাতের অন্ধকারে প্রায় নিঃশব্দে এসে হঠাৎ করে বোমা নিক্ষেপ করে আবারো তারা রাতের অন্ধকারে মিশে যেত। এই কারণেই জার্মান সৈনিকরা তাদেরকে বলত ‘Nachthexen’ ইংরেজিতে যার অর্থ দাড়ায় ‘Night Witches’। প্রতিটি সফল অভিযানের পর পাইলট নিজ রেজিমেন্টে ফির এসে আবারো দুইটি বোমা বহন করে নিজের পরের অভিযানে চলে যেত। এভাবে প্রতিরাতেই একজন পাইলট ও নেভিগেটর একসাথে ৮টি বা তার অধিক অভিযানে যেত।

জার্মানরা এই ‘রাতের ডাইনি’-দেরকে একইসাথে ঘৃণা এবং সমীহ করত। সোভিয়েত এই নারী পাইলটরা তাদের কাছে কত বড় হুমকি ছিল তার সহজ প্রমাণ হচ্ছে যেসকল জার্মান পাইলট ৫৮৮ রেজিমেন্টের একটি বিমানকেও ভূপাতিত করতে পেরেছে তাদেরকে যুদ্ধের বীরত্বের পদক ‘Iron Cross Medal’ দেয়া হয়েছে।

১৯৪২-এর জুন মাসের ২৮ তারিখে ৫৮৮ রেজিমেন্ট তাদের প্রথম অভিযান পরিচালনা করে। তারপর থেকে ২য় বিশ্বযুদ্ধের শেষ অবধি এই রেজিমেন্ট যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছে। এই সময়ে তারা ৩০ হাজারের অধিক অভিযান পরিচালনা করে, যেখানে তারা সম্মিলিতভাবে ২৩ হাজার টনের অধিক ওজনের বোমা শত্রুপক্ষের উপর ফালায়। তাদের ৩০ জন পাইলট যুদ্ধে শহীদ হন, যাদের মধ্যে ২৪ জনকে ‘Hero of The Soviet Union’ উপাধি দেয়া হয়েছিল।

এই রেজিমেন্ট তৈরির পেছনের মূলহোতা, রাস্কোভা, ১৯৪৩ সালের ৪ জানুয়ারি বিমান চালনার সময়ে শহীদ হন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছিল।

যুদ্ধের সময় শত্রুকে প্রতিহত করতে এত বড় ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির মাত্র ৬ মাসের মধ্যেই এই রেজিমেন্টকে ভেঙ্গে ফেলা হয়। কিন্তু আধুনিক সম্মুখযুদ্ধে প্রথমবারের মত নারীদের অংশগ্রহণ এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধের এক ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এই ‘ডাইনি’-দের দল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *