কথায় অাছে, জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো। অাসলেও তাই। কেবল কর্মই পারে জাতি-বর্ণ-গোত্রের পূর্ব পরিচয় ভুলিয়ে একজন মানুষকে নতুন পরিচয় এনে দিতে। ফুটবলেও তার ব্যতিক্রম নেই। এমন অনেক খেলোয়াড়ই আছেন যারা জন্ম নিয়েছেন এক দেশে কিন্তু জাতীয়তা পরিবর্তন করে খেলেছেন বা খেলতে বাধ্য হয়েছেন আরেক দেশের হয়ে। এবং তৈরি করেছেন নতুন অাত্মপরিচয় এবং ইতিহাস। চলুন জেনে নেয়া যাক তাদের কয়েকজনের কথা।

১.দিয়েগো কস্তা

ব্রাজিল থেকে স্পেন

দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য জাতীয়তা পাল্টেছেন এমন ফুটবলারদের কথা বলতে গেলে সবার অাগেই দিয়োগো কস্তার নাম চলে অাসে। স্পেনের জার্সি পড়ে মাঠ মাতানো এই অ্যাথলেটিকো তারকার জন্মভূমি কিন্তু স্পেন নয়, ব্রাজিল!

তবে লা-লিগায় খেলার জন্য ২০০৭ হতে স্পেনের বসবাসের সুবাদে ২০১৩ সালে কস্তা স্পেনের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার কারণে আয়োজক দেশ হিসেবে ব্রাজিলকে বাছাই পর্বের কোনো ম্যাচ খেলতে হয়নি। তাই অন্যদলগুলো যখন বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে লড়ছিলো, ব্রাজিল তখন প্রীতি ম্যাচ খেলতে ব্যস্ত। দিয়েগো কস্তা সেসময় ব্রাজিলের হয়ে দুইটি প্রীতি ম্যাচ খেলেন মাত্র।

ফিফার নিয়ম হলো, যদি কোনো খেলোয়াড় কোনো দেশের হয়ে ফিফার আনুষ্ঠানিক কোনো ম্যাচ না খেলেন তাহলে তিনি তার জাতীয়তা পরিবর্তন করে অন্য দেশের হয়ে খেলতে পারেন। ফলে স্পেন ফুটবল এসোসিয়েশন ফিফার কাছে অনুরোধ করলে ফিফা কস্তাকে স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ দেয়। অার অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের খেলোয়াড় কস্তার সামনে সুযোগ আসে স্পেনের হয়ে নিজ দেশে বিশ্বকাপ খেলার।

স্পেনের জার্সিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কস্তার অভিষেক ঘটে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর থেকে প্রতি বিশ্বকাপ কিংবা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে কস্তা স্পেনের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে চলেছেন সগৌরবে।

২.মিরোস্লাভ ক্লোসা

পোল্যান্ড থেকে জার্মানি

জার্মানির হয়ে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলেও ক্লোসার জন্মভূমি কিন্তু জার্মানি নয়। ক্লোসার বাবা ছিলেন একজন জার্মান যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি থেকে পোল্যান্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাই ক্লোসার জন্ম হয় পোল্যান্ডে।

১৯৮৬ সালে ৮ বছর বয়সে মিরোস্লাভ ক্লোসা পরিবারের সাথে জার্মানিতে ফেরত আসেন। গ্রামের ক্লাব এসজি ব্লাওবাক ডাইডেলকফের হয়ে ক্লোসার ফুটবল জীবনের সূচনা ঘটে। এটি জার্মান লীগের সপ্তম বিভাগের একটি ক্লাব।এরপর ২০০১ সালে বুন্দেসলিগায় ক্লোসার অভিষেক ঘটে।

এরপর পোল্যান্ডের তৎকালীন কোচ তাকে পোল্যান্ডের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেন। কিন্তু মিরোস্লাভ ক্লোসা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং জার্মানির হয়ে খেলার অভিলাষ ব্যক্ত করেন। ২০০১ সালেই জার্মানির হয়ে ক্লোসার অভিষেক হয় এবং তিনি জার্মানির হয়ে বিশ্বকাপ, ইউরো সহ সকল প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন।

মিরোস্লাভ ক্লোসা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার অাসনে বসে অাছেন। তিনি ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের পর অবসরে গিয়েছেন।

৩.লুকাস পোডলস্কি

পোল্যান্ড থেকে জার্মানি

পোডলস্কির জন্ম ১৯৮৫ সালে পোল্যান্ডের শিল্প নগরী গ্লিউইচে। তার বাবার নাম ওয়ালদেমার পোডলস্কি এবং মায়ের নাম ক্রিস্টিনা পোডলস্কি। জন্মের দুই বছর পরেই বাবা-মার হাত ধরে লুকাস পোডলস্কি পোল্যান্ড থেকে পাড়ি জমান জার্মানিতে।

২০০৩ সালে বুন্দেসলিগাতে ভালো পারফরম্যান্সের সুবাদে পোডলস্কির পোল্যান্ড দলে অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় করেন। কিন্তু পোল্যান্ডের তৎকালীন কোচ পাওয়েল জেনাস পোডলস্কিকে প্রত্যাখান করার পাশাপাশি বলেন যে, পোডলস্কির চেয়ে ভালো মানে স্ট্রাইকার পোল্যান্ডে রয়েছে।

এর এক বছর পরই ২০০৪ সালের ৬ জুন জার্মানির অনুর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে পোডলস্কির অভিষেক ঘটে। সেখান থেকে জাতীয় দলে অভিষেক এবং পরে জার্মানির অাক্রমণভাগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন তিনি। কিছুদিন অাগে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পোডলস্কি অভিযোগ করেন জার্মানির অনুর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলার অাগ পর্যন্ত পোলিশ ফুটবল ফেডারেশন তাকে কোনো প্রস্তাব দেয়নি।

লুকাস পোডলস্কি অাসলেই সৌভাগ্যবান। কেননা জার্মান জাতীয় দলের হয়ে খেলার কারণেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। কিন্তু পোল্যান্ডের হয়ে খেললে সেটা হয়তো সম্ভব হতো না কখনোই।

৪.পেপে

ব্রাজিল থেকে পর্তুগাল

পর্তুগালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার পেপে অাদতে একজন ব্রাজিলিয়ান। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে পর্তুগিজ ক্লাব সিএস মারিতিমোর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে পর্তুগালে পাড়ি জমান তিনি। এরপর তিনি ডাক পান পর্তুগাল জাতীয় ফুটবল দলে।

পর্তুগাল দলে যোগ দেওয়ার আগে পেপে ব্রাজিলের কোনো বয়সভিত্তিক দলেও ডাক পাননি। তবে ২০০৬ সালে ব্রাজিলের তৎকালীন কোচ দুঙ্গা পেপের সাথে যোগাযোগ করে জানান ভবিষ্যতে তাকে ব্রাজিল দলে সুযোগ দেওয়া হবে।

কিন্তু পেপে ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তিনি পর্তুগালের হয়ে খেলবেন। ২০০৭ সালের আগস্টে তিনি পর্তুগালের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং ৩০ আগস্ট তার নাম পর্তুগাল জাতীয় দলের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু অনুশীলনের সময় চোট পাওয়ার কারণে পর্তুগালের হয়ে পেপের অভিষেক বিলম্বিত হয়।

২০০৭ সালে ২১ নভেম্বর ফিনল্যান্ড বনাম পর্তুগাল ম্যাচে পেপের অভিষেক হয়। এরপর পর্তুগালের হয়ে পেপে ২০১৬ সালে ইউরো জিতেছেন এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ম্যাচে তিনি ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন।

৫.কেভিন-প্রিন্স বোয়েটাং

জার্মানি থেকে ঘানা

বোয়েটাং… বোয়েটাং…নামটা কি চেনা চেনা লাগছে না? হ্যা, কেভিন-প্রিন্স বোয়েটাং হচ্ছেন জার্মান ডিফেন্ডার জেরোমি বোয়েটাংয়ের সৎভাই।

ভাই জেরোমির মতো কেভিনের জন্মও জার্মানিতে এবং সেখানেই বেড়ে ওঠা। তার ক্লাব অভিষেক ঘটে জার্মান ক্লাব হের্থা বিএসসির হয়ে। এরপর কেভিন বোয়েটাং সুযোগ পান জার্মানির অনুর্ধ্ব-১৯ এবং অনুর্ধ্ব-২১ দলে। কিন্তু নিয়ম ভাঙার কারণে ২০০৭ সালে তাকে অনুর্ধ্ব-২১ দল থেকে বাদ দেওয়া হয়।

২০০৯ সালে কেভিন জার্মানির অনুর্ধ্ব-২১ দলে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে তিনি কর্তৃপক্ষকে জানান যে, তিনি জার্মানির হয়ে আর খেলতে চান না। ২০১০ সালে তিনি ঘানার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। এমনকি ঘানা জাতীয় দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপও খেলেন তিনি।

কিন্তু এর একবছর পরই ২০১১ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে অবসরের ঘোষণা দেন কেভিন বোয়েটাং। কারণ হিসেবে তিনি জার্মানি থেকে ঘানায় বার বার ভ্রমণকে উল্লেখ করেন। তবে পরবর্তীতে তিনি মত পাল্টান এবং ২০১৪ সালে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ খেলতে আসেন। কিন্তু দলের নিয়ম ভাঙার কারণে তাকে ঘানায় ফেরত পাঠানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *