রাত প্রায় তিনটা বাজে। নিতু চোখ বুজে বিছানায় শুয়ে আছে। তার ঘুম আসছে না। বেশ কয়দিন ধরেই তার এই সমস্যাটা হচ্ছে। সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা, সে একদমই দিশেহারা। ভালমতো ঘুম না হলে কি পড়ায় মন বসে? কিন্তু কী করবে সে?

হঠাৎ নিতু বুঝতে পারলো যে, সে কোনো এক মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। ব্যাধিটির নাম ইনসোমনিয়া।

কী এই ইনসোমনিয়া ?

ইনসোমনিয়া মূলত কোন রোগ নয়, বরং একটি অবস্থা। ঘুমাতে না পারার অক্ষমতা বা একটি নির্দিষ্ট সময় ঘুমিয়ে থাকতে না পারার অবস্থাকেই ইনসোমনিয়া বলে। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এই সমস্যাটা দিন দিন আর প্রকট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন কারনে ইনসোমনিয়া হতে পারে- মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, বিষন্নতা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি।

শ্রেণীবিন্যাস:

ইনসোমনিয়াকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়-

১. ইনিশিয়াল ইনসোমনিয়া: এদের ঘুম আসতে দেরি হয়।

২. মিডল ইনসোমনিয়াঃ এদের ঘুম বার বার ভেঙ্গে যায়।

৩. গ্লোবাল ইনসোমনিয়া: উপরের দুটি লক্ষণই পাওয়া যায় এদের মধ্যে।

উপসর্গ/লক্ষণ:

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন প্রকাশিত ডায়গনোস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল ফর মেন্টাল ডিসঅর্ডার এর কতগুলো লক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

এক্ষেত্রে নিদ্রা বা ঘুমের পরিমান এবং গুনগত মান নিয়ে ব্যক্তির মনে উল্লেখযোগ্যভাবে অসন্তুষ্টি দেখা যায়। যেমন, ঘুম আসতে সমস্যা হয়। অবিরতভাবে বা স্বতঃস্ফুর্তভাবে ঘুমাতে সমস্যা হয় অর্থাৎ বার বার ঘুম থেকে জেগে উঠে অথবা ঘুম থেকে জাগার পর আবার ঘুম আসতে সমস্যা হয়। অতি সকালে ঘুম থেকে জেগে যায় এবং পুনরায় ঘুম আসার ক্ষমতা থাকে না। ঘুমের ব্যাঘাতের কারণে তাৎপর্যপূর্ণভাবে সামাজিক, পেশাগত আচরনে এবং অন্যান্য আরও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটে থাকে। ঘুমের সমস্যা মাসে অন্তত তিনবার দেখা যায়। এই ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই সমস্যা দেখা দেয়।

এছাড়া কিছু বিশেষায়িত লক্ষণও দেখা যায়-যেমন,

এপিসোড: এপিসোড তখনই বলা হবে যখন লক্ষণগুলো অন্ততপক্ষে একমাস থাকবে কিন্তু তিন মাসের কম সময় থাকবে।

পারসিস্টেন্স: লক্ষণগুলো তিন মাস বা তার বেশি হলে বলা হয় পারসিস্টেন্স টাইপ।

রিকারেন্ট: এক বছরের মধ্যে অন্ততপক্ষে দুই থেকে ততোধিকবার এই এপিসোড দেখা যায়।

কাদের ভিতর এই সমস্যাটি বেশি দেখা যায়:

মূলত মধ্যবয়সী ছেলে মেয়েরাই এতে বেশি আক্রান্ত হয়। আর ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বেশি দেখা যায় এই সমস্যাটি, এবং যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে প্রথম এপিসোড প্রাপ্তবয়স্ক তরুণদের অভ্যাস হয়। যেমন-

বিছানায় অতিরিক্ত সময় অতিবাহিত করা, ঘুমের নির্দিষ্ট সময়সূচী না থাকা, ঘুম হবে না এই ভয়ে থাকা, আবার দিনের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটবে তা নিয়ে আশঙ্কা করা, তাছাড়া নির্ঘুম রাত্রিগুলোতে তার মধ্যে কিছু কাজ করার অভ্যাস হয় যার কারনেও সেই সময় সে ঘুম থেকে জেগে উঠে।

ইনসোমনিয়া সম্পর্কে কিছু ভুল ধারনা:

অনেকেই ইনসোমনিয়াকে অন্যান্য স্লিপিং ডিসঅর্ডারের সাথে তুলনা করে, যেমন-একে নারকোলেপ্সি, ব্রিদিং-রিলেটেড স্লিপ ডিসঅর্ডার, সারকাভিয়ান রিদিম স্লিপ ওয়াক ডিসঅর্ডার এবং প্যারাসোমনিয়া দ্বারা ব্যাখ্যা না করাই ভাল।

ইনসোমনিয়া কোন সাবস্টেন্স (মাদকদ্রব্য) নেওয়ার ফলে শারীরিক প্রভাব নয়।

সৃষ্ট জটিলতাসমূহ:

অনিদ্রার সঙ্গে ওজন বেড়ে যাওয়ার সরাসরি একটি সম্পর্ক আছে। যারা অনিদ্রায় ভুগে, তাদের মোটা হওয়ার ঝুকি বেশি। আর বেশি বিরক্ত থাকার কারণে তাদের বিপাকেও সমস্যা দেখা দেয়। অনেকদিন ইনসোমনিয়ায় ভুগলে মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে আত্মহত্যার প্রবণতাও জন্ম নিতে পারে।

চিকিৎসা:

ইনসোমনিয়া যে কারণে হয়েছে তার চিকিৎসাই প্রথমে করা হয়। তাছাড়া ইনসোমনিয়ার জন্য আলাদা করে কিছু ওষুধ দেওয়া হয়। ইনসোমনিয়া রোগীর চেহারায় একটা অবসাদ, ক্লান্তিভাব আসে। কিছু চিকিৎসক রোগীদের কগনিটিভ বিহ্যাভিয়ার থেরাপি (CBT) নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

করণীয়:

*বিছানা শুধু ঘুমের জন্যই নির্দিষ্ট করে রাখুন। বিছানায় শুয়ে টিভি দেখা, আড্ডা দেওয়া, খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।

*শোয়ার আগে এক গ্লাস দুধ খেতে পারেন। কারন দুধে ট্রিপ্টোফ্যান থাকে, যা ঘুমাতে সাহায্য করে।

*খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে বিছানায় যাওয়া ঠিক নয়

*ঘুমাতে যাওয়ার আগে খুব ভারী কাজ বা অত্যাধিক মানসিক শক্তি খরচ হয়, এমন কাজ করা উচিৎ না

*প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

*ঘুমাতে যাওয়ার আগে সিগারেট, তামাক, কফি, চা না খাওয়াই ভাল।

ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রার হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি সুস্থ জীবনযাত্রার প্রয়োজন। সবকিছুতে নিয়মানুবর্তী হতে হবে। এরপর ভাল ঘুমের অভ্যাস যদি তৈরি করেন, ঘুমের স্বাস্থ্যবিধির মধ্যে দিয়ে যান, তাহলেই অনিদ্রার হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *